ফিফা সংস্কার জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত পদক্ষেপের পর ফিফার সংস্কার এখন সময়ের দাবি। ক্ষমতা হ্রাস, বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উপায় জানুন এই প্রতিবেদনে। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ বিতর্ক এবং ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নিয়ে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর (Gianni Infantino) প্রবল সমালোচিত পরিকল্পনার পর, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার (FIFA) আমূল সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফুটবলের এই অচলাবস্থা নিরসনে ফিফার বাণিজ্যিক ও নিয়ন্ত্রক শাখাগুলোকে আলাদা করা, একটি স্বাধীন বাহ্যিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন এবং সভাপতির একচেটিয়া ক্ষমতা হ্রাস করা অপরিহার্য। ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থে এবং এর হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অবিলম্বে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, তহবিলের যৌক্তিক বণ্টন এবং ভক্তদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফিফার নির্বাচকমণ্ডলীর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
ফিফার কাঠামোগত বিভাজন কেন অপরিহার্য?
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া ইভেন্ট পরিচালনা করছে এবং ফুটবলের সমস্ত নিয়মকানুন নির্ধারণ করছে, যা একটি সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest)। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে আমরা এই সংঘাতের চরম বাস্তবায়ন দেখেছি, যেখানে ফিফা অধিক মনোযোগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্যিক লাভের আশায় নিজস্ব নিয়মকানুন—যেমন খেলোয়াড়দের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বা হাফ-টাইমের সময়সীমা—লঙ্ঘন করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। ফিফার অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এক সূত্রের মতে, “তারা প্রমাণ করেছে যে বাড়তি অর্থ উপার্জনের জন্য তারা যেকোনো নিয়ম বাঁকাতে পারে; যা একটি বিশাল কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট।” এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, দ্য গার্ডিয়ানের এক গভীর বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুযায়ী ফিফার বাণিজ্যিক এবং নিয়ন্ত্রক শাখাগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু তাই নয়, ফিফার উন্নয়নমূলক শাখা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোকেও পৃথক কর্পোরেট সত্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো একটি শাখার প্রভাব অন্য শাখার ওপর না পড়ে এবং ফুটবলের নিয়মকানুন বাণিজ্যিকীকরণ থেকে রক্ষা পায়।
ফিফার গভর্ন্যান্স কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমানের অন্যতম প্রধান সমালোচক মিগুয়েল মাদুরো (Miguel Maduro) মনে করেন, ভিন্ন ভিন্ন কর্পোরেট সত্তা তৈরির মাধ্যমে ফিফার বিভিন্ন অগ্রাধিকার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। তিনি বলেন, “এই শাখাগুলোর মধ্যে একটি ‘চাইনিজ ওয়াল’ (Chinese Wall) বা দুর্ভেদ্য দেয়াল থাকতে হবে এবং তাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।” অর্থাৎ, যারা বাণিজ্যিক আয় সর্বোচ্চ করার (Maximise Commercial Income) জন্য কাজ করবে, তারা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হবে না এবং যারা নিয়মকানুন নিয়ে কাজ করবে, তারা বাণিজ্যিক লাভ-ক্ষতি দ্বারা প্রভাবিত হবে না। এক অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বাতিল হয়ে যাওয়া বিতর্কিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (FFE) প্রকল্প এ ধরনের একটি বিভাজন তৈরি করত ঠিকই, কিন্তু সেটি হতো সম্পূর্ণ ভুল এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার গোপন উদ্দেশ্যে।
ফিফার ওপর বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা এক্সটার্নাল রেগুলেশন কীভাবে কাজ করবে?
ফিফার মতো একটি অপরিমেয় ক্ষমতাধর সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের আশা করা নিছক বোকামি; পরিবর্তন আসতে হবে বাইরে থেকে। মিগুয়েল মাদুরো স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “পরিবর্তন বাইরে থেকে চাপিয়ে দিতে হবে, এটি ভেতর থেকে কখনোই আসবে না।” সমালোচকরা মনে করেন, বিশ্ব ডোপিং বিরোধী সংস্থার (Wada) আদলে একটি নতুন গ্লোবাল গভর্ন্যান্স বডি (Global Governance Body) তৈরি করা প্রয়োজন, যা শুধু ফিফা নয়, বরং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোকেও সুশাসনের আওতায় রাখবে। ফুটবল বিশ্বে বর্তমানে যে পরিমাণ বিলিয়ন ডলার অর্থের ছড়াছড়ি, তা দিয়ে সহজেই এমন একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিচালনা করা সম্ভব। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই বডি কার অধীনে বা কীভাবে গঠিত হবে? মাদুরোর প্রস্তাব হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া সংস্থা (World Sports Agency) গঠন করা, যা ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর নৈতিকতা ও কমপ্লায়েন্স কঠোরভাবে তদারকি করবে।
এই প্রেক্ষাপটে উয়েফার (Uefa) ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইনফান্তিনোর বিতর্কিত এফএফই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উয়েফার কঠোর ও সম্মিলিত প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় ফুটবল কাঠামো ধীরে ধীরে ব্রাসেলসের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কাছাকাছি যাচ্ছে এবং তারা ফিফাকে আর একচেটিয়া ক্ষমতা উপভোগ করতে দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে, ‘ইউরোপিয়ান লিগস’ (European Leagues) নামের আরেকটি প্রভাবশালী সংগঠন ফিফা বিশ্বকাপের দল ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করার ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইউরোপিয়ান কমিশনের (European Commission) হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, “সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা রক্ষা করতে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালতের নীতিগুলো নিশ্চিত করতে কমিশনের প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।” ফিফাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হলে এই ধরনের বাহ্যিক আইনি চাপ এবং রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করা ছাড়া ফুটবলের স্বচ্ছতা ফেরানো প্রায় অসম্ভব।
| প্রস্তাবিত সংস্কার খাত | লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য | সম্ভাব্য ফলাফল |
| কাঠামোগত বিভাজন | বাণিজ্যিক ও নিয়ন্ত্রক শাখা সম্পূর্ণ আলাদা করা | স্বার্থের সংঘাত হ্রাস পাবে এবং নিরপেক্ষতা আসবে |
| বাহ্যিক রেগুলেশন | ‘ওয়াডা’ (Wada)-র আদলে স্বাধীন মনিটরিং সংস্থা গঠন | ফিফাকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে |
| ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ | সভাপতির একচেটিয়া ক্ষমতা রোধ ও টার্ম নির্ধারণ | স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বন্ধ হবে |
| আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ | আন্তর্জাতিক অডিট রিপোর্ট প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা | তহবিলের অপব্যবহার ও দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা যাবে |
| তহবিল বণ্টন সংস্কার | ভোটের বদলে প্রকৃত ফুটবলীয় চাহিদার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ | তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন হবে |
| নির্বাচকমণ্ডলী পরিবর্তন | ভক্ত ও প্রকৃত ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ভোটাধিকার প্রদান | রাজনীতিমুক্ত এবং ফুটবলের পক্ষের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হবে |
ফিফা সভাপতির ক্ষমতা হ্রাস করা কি ফুটবলের জন্য মঙ্গলজনক?
ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, একজন একক ব্যক্তির হাতে অপরিসীম ক্ষমতা থাকা ফুটবলের জন্য কতটা বিপজ্জনক। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ বা এফএফই কেলেঙ্কারিতে দেখা গেছে যে, সম্পূর্ণ স্কিমটি ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত অফিসের বাইরে কারও অজান্তেই অত্যন্ত গোপনে তৈরি করা হয়েছিল। মিগুয়েল মাদুরো আক্ষেপ করে বলেন, “সভাপতির কাজ কখনোই প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল না, কিন্তু তিনি প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিজের কুক্ষিগত করে নিয়েছেন।” ফিফা কাউন্সিলের মূল দায়িত্ব ছিল সভাপতিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কংগ্রেসের বাইরে বড় সিদ্ধান্তগুলোতে অংশগ্রহণ করা, কিন্তু তারা সেটি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ইনফান্তিনো এবং ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর সমন্বয়ে গোপন সুপার লিগ প্রকল্প নিয়ে সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর তথ্য আবারো প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে ফিফার ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ (Checks and Balances) নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সভাপতির একচেটিয়া ক্ষমতা হ্রাস করার একটি চমৎকার ও যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছেন আন্তর্জাতিক গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ মার্ক পিথ (Mark Pieth), যা পূর্বে উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চ্যাফেরিনও (Aleksander Ceferin) উত্থাপন করেছিলেন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিফার ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের প্রধানরা পর্যায়ক্রমে এক বছরের জন্য ফিফা সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। পিথ বলেন, “এটি কোনো অবাস্তব ধারণা নয়। আমি একজন সুইস নাগরিক এবং আমার দেশে এভাবেই সাতজন মন্ত্রী পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, ফলে কে এরপর রাষ্ট্রপতি হবেন তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। এতে কেউ অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে পারে না।” এই আবর্তনশীল পদ্ধতির ফলে ফিফার একক সভাপতির হাতে বিলিয়ন ডলারের তহবিল নিয়ন্ত্রণের স্বৈরাচারী ক্ষমতা থাকবে না। মূলত, ফিফা সভাপতির কাজ হওয়া উচিত শুধু সাংগঠনিক বিষয়গুলো পরিচালনা করা, নিজের ইচ্ছেমতো গোপন প্রজেক্ট অনুমোদন করে ফুটবলকে বাণিজ্যের হাতিয়ার বানানো নয়।
ফিফার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?
মানবাধিকার লঙ্ঘন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বিদ্যমান আপিল ব্যবস্থার চরম অস্বচ্ছতা ফিফার অন্যতম বড় কলঙ্ক, যা প্রতিনিয়ত ফুটবলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। যারা ফিফাকে তাদের মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চান, তাদের জন্য ফিফার অস্বচ্ছতা দীর্ঘদিনের হতাশার কারণ। ঠিক একইভাবে, ফিফা বিশাল পরিমাণ অর্থ কীভাবে আয় করে এবং সেটি তার সদস্য সংস্থাগুলোর মধ্যে কীভাবে বণ্টন করে, তা আজও এক বড় রহস্য। অলাভজনক সংস্থা ফেয়ার স্কয়ার (Fair Square)-এর পরিচালক ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিক ম্যাকগিহান (Nick McGeehan) ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতার তীব্র সমালোচনা করে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, “ফিফার অডিটেড অ্যাকাউন্ট বা হিসাবের খাতা কোথায়?” একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে ফিফার যে পরিমাণ আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা (Transparency and Accountability) থাকা প্রয়োজন, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না।
ম্যাকগিহান আরও গভীরভাবে উল্লেখ করেন যে, “ফিফার ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন বাজেট বিশ্বের বড় বড় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমান। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে এবং কোন যুক্তিতে বণ্টন করা হচ্ছে, তার কোনো নিডস অ্যানালাইসিস (Needs Analysis) বা চাহিদা বিশ্লেষণ নেই, এমনকি অডিটের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণও নেই।” ফিফার ওয়েবসাইটে অর্থ ব্যয়ের অনেক ধরনের ডেটা দেওয়া থাকলেও, সেই অর্থের প্রকৃত ব্যবহার যাচাই করতে গেলে দেখা যায় সেটি একেবারেই অসম্ভব। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো গণমাধ্যমের সাথে বেশি বেশি মতবিনিময় করা এবং মুক্ত সাংবাদিকতার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু ইনফান্তিনো মনে হয় চার বছরে মাত্র একবার বিশ্বকাপ চলাকালে প্রেস কনফারেন্স ডাকেন। ম্যাকগিহানের মতে, এটি গণমাধ্যমের প্রতি একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রসুলভ অবিশ্বাস (Authoritarian state-style distrust), যা প্রমাণ করে ফিফা তাদের ভেতরের দুর্নীতি ও দুর্বলতাগুলো ঢাকতে চায়।
ফিফার উন্নয়ন তহবিল এবং নির্বাচকমণ্ডলীর সংস্কার কেন জরুরি?
ফিফা সর্বদাই নিজেকে একটি ‘অলাভজনক সংস্থা’ হিসেবে দাবি করে এবং বলে যে এর সমস্ত আয় ফুটবলের উন্নয়নেই পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়, যা ইনফান্তিনোর যুগে একটি মুখস্থ বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার (১৫০০ কোটি ডলার) আয়ের পর, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ফিফার প্রতিটি সদস্য দেশ প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার করে অনুদান পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের ওপর যেমন কোনো স্বাধীন নজরদারি নেই, তেমনি এর বণ্টনের যৌক্তিকতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। ফিফা পর্যবেক্ষকদের মতে, “এক দেশ, এক ভোট এবং সবাইকে সমান পরিমাণ অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ মন্টসেরাট বা জিব্রাল্টারের মতো ছোট দেশের ফুটবলের অবকাঠামোগত চাহিদা আর নাইজেরিয়া বা ভারতের মতো বিশাল দেশের চাহিদা কখনোই এক হতে পারে না।” ফিফা মূলত ভোটের আনুপাতিক হারে (Proportion to Votes) অর্থ বিতরণ করছে, প্রকৃত উন্নয়ন বা ফুটবল প্রসারের কৌশলগত লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়, যা তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।
তহবিল বণ্টনের এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ইনফান্তিনোকে ২১১ জন সদস্য সংস্থার প্রধানদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে রেখেছে, কারণ বিনা প্রশ্নে সবাই বিশাল অংকের টাকা পাচ্ছে। কিন্তু কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে ফিফার নির্বাচকমণ্ডলী বা যারা ভোট দেন, তাদের কাঠামো পরিবর্তন করা অপরিহার্য। একজন শীর্ষ ফুটবল কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফিফার মিটিংয়ে এমন খুব কম মানুষই দেখা যায় যাদের মাঠে খেলার, কোচিং করানোর বা ক্লাবের নির্বাহী হিসেবে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।” বর্তমান নির্বাচকমণ্ডলীতে নারীদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে, আর ফুটবল ভক্তদের তো গোনাতেই ধরা হয় না। রাজনৈতিক পরামর্শক আশিস প্রশান্তের (Ashish Prashar) মতে, কনফেডারেশনগুলোর উচিত এমন একটি নতুন সত্তা গঠন করা যেখানে ফুটবলের মূল অংশীজন অর্থাৎ ভক্তদের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে। যদি একটি বৈচিত্র্যময় নির্বাচকমণ্ডলী (Diverse Electorate) তৈরি করা যায়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে, যা ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।
FAQ
১. ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FFE) কী এবং কেন এটি বিতর্কিত?
ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) হলো জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার ও টুর্নামেন্টের অংশীদারিত্ব প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এটি অত্যন্ত গোপনে এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের মতামত ছাড়াই প্রণয়ন করা হয়েছিল বলে তীব্র সমালোচনার মুখে বাতিল হয়।
২. মিগুয়েল মাদুরো ফিফার কাঠামোগত বিভাজনের ব্যাপারে কী প্রস্তাব দিয়েছেন?
ফিফার গভর্ন্যান্স কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মিগুয়েল মাদুরো প্রস্তাব দিয়েছেন যে, ফিফার বাণিজ্যিক, নিয়ন্ত্রক এবং উন্নয়ন শাখাগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদা কর্পোরেট সত্তা হিসেবে গঠন করতে হবে। এদের মধ্যে একটি দুর্ভেদ্য দেয়াল থাকবে যাতে বাণিজ্যিক স্বার্থ কখনোই ফুটবলের নিয়মকানুনকে প্রভাবিত করতে না পারে।
৩. ফিফাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বাহ্যিক রেগুলেটর বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন প্রয়োজন?
ফিফার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি-ডোপিং এজেন্সির (Wada) আদলে একটি বৈশ্বিক স্বাধীন ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করতে হবে, যা ফিফাকে বাইরে থেকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে।
৪. উয়েফা (Uefa) এবং ইউরোপিয়ান লিগগুলো কেন ইনফান্তিনোর ওপর ক্ষুব্ধ?
উয়েফা এবং ইউরোপিয়ান লিগগুলো ইনফান্তিনোর ওপর ক্ষুব্ধ কারণ তিনি তাদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই বিশ্বকাপের দল ৪৮ থেকে ৬৪-তে উন্নীত করা এবং এফএফই-এর মতো গোপন বাণিজ্যিক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। তারা মনে করে, ফিফা তার ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করছে এবং ফুটবলের মূল কাঠামো ধ্বংস করছে।
৫. ফিফার বর্তমান তহবিল বণ্টন ব্যবস্থায় মূল সমস্যাটি কোথায়?
ফিফার বর্তমান তহবিল বণ্টন ব্যবস্থায় মূল সমস্যা হলো “এক দেশ, এক ভোট এবং সমান অর্থ” নীতি। এর ফলে একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং একটি বিশাল জনসংখ্যার দেশ সমান অর্থ পায়। অর্থাৎ, প্রকৃত ফুটবলের চাহিদা বা তৃণমূল উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে কেবল ভোট নিশ্চিত করার জন্যই এই অনুদান দেওয়া হয়।
৬. ফিফার নির্বাচকমণ্ডলী বা ভোটার কাঠামো পরিবর্তনের দাবি কেন উঠছে?
বর্তমান নির্বাচকমণ্ডলীতে এমন সব কর্মকর্তারা রয়েছেন যাদের মাঠের ফুটবল বা ক্লাব পরিচালনার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া এতে ভক্তদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে একটি বৈচিত্র্যময় এবং প্রকৃত ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নতুন নির্বাচকমণ্ডলী গঠনের দাবি উঠেছে।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার (FIFA) বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে একচেটিয়া ক্ষমতা, বাণিজ্যিকীকরণের আগ্রাসন এবং স্বচ্ছতার অভাব এই সংস্থাকে এমন এক খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এখন কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য। জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন প্রমাণ করেছে যে, ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং বাণিজ্যিক ফায়দা লোটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) থেকে শুরু করে গোপন সুপার লিগ চুক্তি এবং বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের মতো বিতর্কিত ও একতরফা সিদ্ধান্তগুলো ফুটবলের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর চরম ব্যর্থতারই জ্বলন্ত প্রতিফলন।
এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত কাঠামোগত বিভাজন, বাহ্যিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন এবং সভাপতির ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা ছাড়া ফিফার সামনে আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। বিশেষ করে ফিফাকে ‘ওয়াডা’ (Wada)-র মতো একটি গ্লোবাল রেগুলেটরি বডির অধীনে আনা গেলে এর আর্থিক লেনদেন, তহবিল বণ্টন এবং মানবাধিকার সংরক্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, ফিফার বিলিয়ন ডলারের তহবিলকে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও ভোট কেনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে, প্রকৃত ফুটবলীয় চাহিদা এবং তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়নে যৌক্তিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
সবশেষে, ফিফা কোনো গুটিকয়েক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের আবেগের অবিচ্ছেদ্য জায়গা। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভক্তদের অংশগ্রহণ এবং ফিফার নির্বাচকমণ্ডলীতে প্রকৃত ফুটবল বোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তি অতিসত্বর নিশ্চিত করতে হবে। উয়েফা (Uefa) এবং অন্যান্য মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলোকে এখন একতাবদ্ধ হয়ে ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরাচারের ওপর আইনি ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। ফুটবলের হারানো গৌরব, নৈতিকতা এবং সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে ফিফাকে তার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করতেই হবে। অন্যথায়, শুধু ফিফা নয়, অদূর ভবিষ্যতে গভীর অস্তিত্বের সংকটে পড়বে গোটা ফুটবল বিশ্ব।
For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News




