শিরোনাম

লিওনেল মেসি কেন গোল করে ক্ষমা চাইলেন, জানুন ২০১৫ ক্লাব বিশ্বকাপের সেই আবেগঘন গল্প!

লিওনেল মেসি কেন গোল করে ক্ষমা চাইলেন, জানুন ২০১৫ ক্লাব বিশ্বকাপের সেই আবেগঘন গল্প!

লিওনেল মেসি গোল করেছেন, আর দু’হাত বাড়িয়ে আকাশের পানে চেয়ে সেই চিরচেনা উদযাপন এই দৃশ্য ফুটবল বিশ্ব দেখেছে শত শত বার। প্রতিটি গোলের পর তার উল্লাস, সতীর্থদের সাথে ছুটে গিয়ে আনন্দ করা, এ সবই এক একটি আইকনিক মুহূর্ত। বার্সেলোনা থেকে পিএসজি, ইন্টার মায়ামি থেকে প্রিয় আর্জেন্টিনা মেসির গোলের পর গ্যালারি ফেটে পড়েছে উল্লাসে।

কিন্তু তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এমন একটি মুহূর্তও আছে, যা এই সবকিছুর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একটি গোল, যার পর মেসি উল্লাস করেননি, হাসেননি, সতীর্থদের দিকেও ছুটে যাননি। বরং, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে হাত তুলেছিলেন ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে।

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা এক বিরলতম অধ্যায়। কেন একজন গোলমেশিন, যার কাজই গোল করা, তিনি গোল করেও এমন থমকে গেলেন? কী এমন আবেগ কাজ করেছিল তার মনে? চলুন, ফিরে যাই সেই ঐতিহাসিক দিনটিতে।

মঞ্চ: ২০১৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনাল

সাল ২০১৫। জাপানের ইয়োকোহামা স্টেডিয়ামে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল। একদিকে ইউরোপের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী চ্যাম্পিয়ন, পেপ গার্দিওলার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া বার্সেলোনা। যে দলে তখন ‘MSN’ (মেসি, সুয়ারেজ, নেইমার) নামক ত্রিফলা, যাদের সামনে বিশ্বের যেকোনো রক্ষণভাগই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তো।

অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন, আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা ক্লাব ‘রিভার প্লেট’। আর্জেন্টিনার ফুটবল আবেগ কতটা তীব্র, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। রিভার প্লেটের হাজার হাজার সমর্থক, যাদের বলা হয় ‘লস মিলিয়োনারিওস’, তারা তাদের জীবনের সর্বস্ব বাজি রেখে, হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে জাপানে এসেছেন। তাদের এই যাত্রাকে শুধু ‘সফর’ বললে ভুল হবে, এটা ছিল এক ‘তীর্থযাত্রা’। একটাই স্বপ্ন—নিজেদের ক্লাবকে বিশ্বসেরার মঞ্চে দেখা, আর তাদের আর্জেন্টাইন হিরো মেসিকে কাছ থেকে দেখা।

সেই আবেগঘন ৩৬ মিনিট

ম্যাচ শুরু হলো। বার্সেলোনার দাপটের সামনে রিভার প্লেট তাদের সাধ্যমতো লড়ছে। কিন্তু সেই আগুনে আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা কঠিন ছিল। ম্যাচের ৩৬ মিনিট। নেইমারের বাড়ানো বল থেকে এক অবিশ্বাস্য দক্ষতায় মেসি বলটি রিসিভ করলেন এবং রিভার প্লেটের গোলকিপারকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দিলেন।

গোওওল! বার্সেলোনা ১-০ গোলে এগিয়ে!

গ্যালারিতে বার্সা সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। কিন্তু মাঠের একজন মানুষ তখন স্তব্ধ। তিনি স্বয়ং লিওনেল মেসি। গোল করার সেই মুহূর্তেই, তার মুখ থেকে চিরচেনা হাসিটা মিলিয়ে গেলো। তিনি সতীর্থদের দিকে না ছুটে ঘুরে দাঁড়ালেন রিভার প্লেটের গ্যালারির দিকে। তারপর ডান হাতটি সামান্য তুলে এমন একটি ভঙ্গি করলেন, যা স্পষ্টতই বলছিল—”আমি দুঃখিত”।

কোনো উল্লাস নেই, কোনো আস্ফালন নেই। আছে শুধু একরাশ বিনয়, সহমর্মিতা আর নিজের দেশের মানুষের প্রতি এক গভীর সম্মানবোধ।

কেন এই ক্ষমা? মেসির নিজের মুখেই শুনুন

ম্যাচটি বার্সেলোনা ৩-০ গোলে জিতেছিল (সুয়ারেজ পরে আরও দুটি গোল করেন)। কিন্তু ম্যাচের পর সব আলোচনা ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে মেসির ওই ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি।

পরে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘স্পোর্টকে’ দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই এই ঘটনার পেছনের আবেগঘন কারণটি তুলে ধরেন। তিনি যা বলেছিলেন, তা যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর মন ছুঁয়ে যাবে:

“আমি জানি ওই ভক্তরা কতটা ত্যাগ স্বীকার করে, কতটা পরিশ্রম করে সেখানে গিয়েছিল এবং তারা এই ম্যাচটি নিয়ে কতটা রোমাঞ্চিত ছিল। তাদের আশা ছিল অনেক। আর তখন আমি, স্বয়ং একজন আর্জেন্টাইন হয়ে, প্রথম গোল করে তাদের সব উদ্দীপনা, সব আশা নষ্ট করে দিলাম। এটা আমার নিজের ভেতরেই খুব কষ্ট দিচ্ছিল।”

মেসি আরও যোগ করেন, “আমি জানি না আমি সত্যিই ক্ষমা চেয়েছিলাম কিনা, বা সেটাকে ঠিক ক্ষমা চাওয়া বলে কিনা, তবে এটা ছিল তাদের প্রতি আমার এক ধরনের সম্মান প্রদর্শন। তাদের কষ্টটা আমি বুঝতে পারছিলাম।”

পেশাদারিত্ব বনাম নাড়ির টান

ভেবে দেখুন, কী এক অবিশ্বাস্য মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে মেসিকে যেতে হয়েছে! একদিকে তিনি বার্সেলোনার খেলোয়াড়, ক্লাবের প্রতি তার পেশাদারিত্ব রয়েছে। গোল করা, দলকে জেতানোই তার দায়িত্ব। অন্যদিকে, গ্যালারিতে বসে থাকা হাজার হাজার মানুষ তার নিজের দেশের, নিজের মাটির। তাদের স্বপ্ন ভাঙার কারণও তিনি নিজেই।

এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মেসি পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন গোল করে, আর নাড়ির টানের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন উদযাপন না করে।

পেশাদারিত্বের ঊর্ধ্বে এক আর্জেন্টাইন হৃদয়

যে লিওনেল মেসিকে বিশ্ব চেনে, তিনি গোল করেই ক্ষান্ত হন না; গোল তার কাছে এক বাঁধভাঙা আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। আমরা তাকে দেখেছি গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে দৌড়ে যেতে, সতীর্থদের কাঁধে লাফিয়ে উঠতে, কিংবা আকাশের দিকে তাকিয়ে তার দাদীকে গোল উৎসর্গ করতে। তার প্রতিটি উদযাপনই যেন এক একটি গল্প। কিন্তু ২০১৫ সালের সেই ফাইনালে, গোল করার পরের কয়েক সেকেন্ডের মেসি ছিলেন সম্পূর্ণ অচেনা, এক অন্য মানুষ। বল জালে জড়ানোর সাথে সাথেই তার পেশাদার দায়িত্ব শেষ হয় এবং শুরু হয় তার ভেতরের আর্জেন্টাইন সত্ত্বার আত্মপ্রকাশ। তার সহজাত উদযাপন, যা প্রায় পেশীগত অভ্যাসের (muscle memory) মতোই, তা সেদিন থমকে গিয়েছিল। তার মুখে কোনো উল্লাস ছিল না, ছিল এক গভীর আত্ম-উপলব্ধি। তিনি জানতেন, এই গোলটি গ্যালারিতে বসে থাকা তার হাজার হাজার দেশবাসীর হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। তাই তার সেই হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিটি ছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া—পেশাদারিত্বের ঠাণ্ডা খোলসের নিচে এক উষ্ণ হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।

শিকড়ের টানে ‘মহানায়ক’: সমালোচকদের নীরব জবাব

এই একটি ঘটনাই মেসির সাথে আপামর আর্জেন্টাইন জনতার সম্পর্ককে এক নতুন, আরও গভীর মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। একটা সময় ছিল যখন খোদ আর্জেন্টিনাতেই মেসির সমালোচনা হতো যে, তিনি “যথেষ্ট আর্জেন্টাইন নন”, তিনি “স্প্যানিশ” হয়ে গেছেন, দেশের জন্য তার নাকি তেমন দরদ নেই। কিন্তু সেই সমালোচকদের মুখের ওপর কী প্রচণ্ড এক নীরব জবাব ছিল মেসির এই ভঙ্গি! তিনি কোনো কথা বলেননি, কোনো সাক্ষাৎকার দেননি, শুধু তার কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছেন—ইউরোপের জাঁকজমক, বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’র দীক্ষা, কিংবা বিশ্বসেরার তকমা—কোনো কিছুই তার ভেতরের সেই রোজারিওর ছেলেটিকে একবিন্দুও বদলাতে পারেনি। তিনি সেদিন রিভার প্লেটকে সম্মান জানাননি, তিনি সম্মান জানিয়েছিলেন গোটা আর্জেন্টিনাকে। তিনি দেখিয়েছিলেন, শিকড় কী জিনিস আর মাটির টান কাকে বলে। এই বিনয় আর স্বদেশপ্রেমই লিওনেল মেসিকে শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নয়, বরং আর্জেন্টিনার আপামর জনতার কাছে এক ‘ঘরের ছেলে’ এবং সত্যিকারের ‘মহানায়ক’-এ পরিণত করেছে।

বিনয়ের পরেও তিক্ত অভিজ্ঞতা

দুর্ভাগ্যবশত, মেসির এই মহানুভবতাও কিছু উগ্র সমর্থকের মন গলাতে পারেনি। ম্যাচ শেষে বার্সেলোনা দল যখন টোকিও বিমানবন্দরে, তখন রিভার প্লেটের কিছু উগ্র সমর্থক মেসিকে উদ্দেশ্য করে কটু কথা বলে, এমনকি তার গায়ে থুতু নিক্ষেপের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটায়।

স্বদেশী একজন কিংবদন্তির সাথে এমন আচরণে গোটা ফুটবল বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য রিভার প্লেট ক্লাব কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার জন্য মেসির কাছে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দেয় এবং সেই উগ্র সমর্থকদের আচরণের নিন্দা জানায়।

যে শিকড় ভোলেননি মেসি

মেসির ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল রিভার প্লেটের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব ‘নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ’-এর যুব দলে। কিন্তু খুব ছোট বয়সেই হরমোনের চিকিৎসার জন্য তাকে আর্জেন্টিনা ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছিল স্পেনে। আর্জেন্টাইন লিগে তাই তার আর পেশাদার ফুটবল খেলা হয়নি।

কিন্তু ইউরোপের জাঁকজমক, একের পর এক ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—কিছুই তার মন থেকে আর্জেন্টিনার প্রতি টান এক মুহূর্তের জন্যও মুছে ফেলতে পারেনি। তিনি সাক্ষাৎকারে প্রায়ই বলেছেন, একদিন তিনি আর্জেন্টাইন ফুটবলে ফিরে যেতে চান।

JitaBet ,  JitaWin , এবং  JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন,   তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!

উপসংহার:

লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারে আরও বড় গোল করেছেন, আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করেছেন। কিন্তু ২০১৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালের এই গোলটি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যাবে না। এই গোলটি মেসির legacy-কে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে, ফুটবলের ঊর্ধ্বে মানবতা আর দেশের প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি। সেদিন জাপানের মাঠে তিনি শুধু একজন সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নন, একজন সংবেদনশীল এবং মহান মানুষ হিসেবেও জিতে গিয়েছিলেন। এই কারণেই লিওনেল মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।

For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News