শিরোনাম

লিওনেল মেসির অবসর ইঙ্গিত: আর্জেন্টিনার সোনার ছেলে কি শেষবারের মতো মাঠে নামছেন?

লিওনেল মেসির অবসর ইঙ্গিত: আর্জেন্টিনার সোনার ছেলে কি শেষবারের মতো মাঠে নামছেন?

লিওনেল মেসি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি আবারও আর্জেন্টাইন সমর্থকদের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছেন। ইন্টার মায়ামির হয়ে লিগস কাপ সেমিফাইনালে জয়ের পর তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচটি হয়তো হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ার ম্যাচ ঘরের মাঠে। ৩৭ বছর বয়সী মেসি এর আগে অনেকবারই অবসরের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে এবার বিষয়টি ভক্তদের কাছে আরও বেশি বাস্তব মনে হচ্ছে।

তিনি জানিয়েছেন, এই বিশেষ ম্যাচে উপস্থিত থাকবেন তার স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও ভাইবোনরা। যা প্রমাণ করে, এটি কেবল একটি খেলা নয়—বরং হতে পারে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির বিদায়ের সূচনা।

লিওনেল মেসি শৈশব ও ফুটবলের সঙ্গে পরিচয়

লিওনেল আন্দ্রেস মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল। মাত্র ৫ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্র্যান্ডোলি-তে খেলা শুরু করেন। তবে শিশুকালে তিনি এক বিশেষ ধরনের হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, যার কারণে তার উচ্চতা স্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল না। চিকিৎসার জন্য অনেক খরচ প্রয়োজন ছিল, যা তার পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন ছিল।

এই সময় বার্সেলোনা এসে তাকে সুযোগ দেয়। কাতালান ক্লাব শুধু তাকে তাদের একাডেমিতে জায়গা দেয়নি, বরং চিকিৎসার পুরো খরচও বহন করেছে। এখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাস গড়ার যাত্রা।

বার্সেলোনায় মেসির উত্থান

২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেক হয় মেসির। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৭ মৌসুমের ক্যারিয়ারে তিনি বার্সেলোনার হয়ে ৬৭২ গোল করেছেন ৭৭৮ ম্যাচে, যা ক্লাবের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড।

বার্সেলোনার হয়ে মেসি জিতেছেন:

  • ১০টি লা লিগা শিরোপা
  • ৭টি কোপা দেল রে
  • ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
  • ৩টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ

মেসি, জাভি ও ইনিয়েস্তার সঙ্গে মিলে বার্সেলোনাকে দিয়েছে “টিকি-টাকা” ফুটবলের সোনালি যুগ।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে উত্থান-পতন

মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৫ সালে। প্রথম ম্যাচেই তিনি লাল কার্ড দেখেন, তবে পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন দলের প্রাণভোমরা।

  • ২০০৮ সালে অলিম্পিকে আর্জেন্টিনাকে স্বর্ণপদক জেতান।
  • ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন, যদিও জার্মানির কাছে হেরে যান।
  • ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন অবসর, পরে ফিরে আসেন।
  • ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন।
  • ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ শিরোপা উপহার দেন।

এটি মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং আর্জেন্টিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের নতুন মোড়।

আর্জেন্টিনায় আবেগের ঝড়

মেসির এই মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) ও কনমেবল (CONMEBOL) বিষয়টিকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে। কনমেবলের অফিসিয়াল পোস্টে লেখা হয়—“দ্য লাস্ট ড্যান্স ইজ কামিং।” ভক্তরা মনে করছেন, এটি হয়তো মেসির শেষ নাচ, শেষ লড়াই জাতীয় দলের হয়ে।

স্টেডিয়ামের টিকিটের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ১০০ ডলার, আর ভিআইপি আসনের দাম প্রায় ৫০০ ডলার। অনেক সমর্থক এই দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, বেশিরভাগই বলছেন—যে করেই হোক শেষবারের মতো মেসিকে দেখতে চান।

মেসি ও আর্জেন্টিনা: এক জটিল ভালোবাসার গল্প

মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ার যেন একটি টেলিনোভেলার মতো। তার শুরুর সময়টা ছিল নানা সমালোচনা আর হতাশায় ভরা। সবসময় তাকে দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা হতো।

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর মেসির চোখের জল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুইবার কোপা আমেরিকা ফাইনালে হেরে তিনি হঠাৎই ঘোষণা দেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের। সেই সময় তিনি বলেছিলেন—“জাতীয় দলের হয়ে আমার সময় শেষ।”

কিন্তু আর্জেন্টাইন জনগণের ভালোবাসা ও দেশের রাষ্ট্রপতির আহ্বানে মেসি আবারও ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তনই বদলে দিয়েছে সবকিছু।

স্কালোনির মাস্টারস্ট্রোক: হতাশা থেকে মহাকাব্যে

লিওনেল স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসিকে ঘিরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল তৈরি করেন। চাপ কমিয়ে দেন তার কাঁধ থেকে, আর সতীর্থরা হয়ে ওঠেন তার প্রকৃত সহযোদ্ধা।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা শিরোপা জেতে। সেটিই ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারানোর মুহূর্তকে আর্জেন্টাইন ভক্তরা এখনও মনে রেখেছেন “মুক্তির রাত” হিসেবে।

এরপর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে জয় পেয়ে আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠার সেই মুহূর্তটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দৃশ্য হয়ে গেছে।

আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ: মেসির পর কারা?

যদি সত্যিই মেসি অবসর নেন, তবে আর্জেন্টিনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ আসবে। তবে তারা একেবারে শূন্য হাতে থাকবে না। হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্টিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো তরুণ তারকারা ইতিমধ্যেই নিজেদের প্রমাণ করেছেন।

কোচ স্কালোনিও জানিয়েছেন, “মেসি যখন খেলা ছেড়ে দেবেন, সেটি হবে তার নিজের সিদ্ধান্ত। আমরা শুধু তাকে উপভোগ করছি, কারণ তিনি ইতিহাসের সেরা।”

অবসরের পর মেসির উত্তরাধিকার

মেসি যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন, তবে তিনি রেখে যাবেন এক মহাকাব্যিক উত্তরাধিকার। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক থেকে শুরু করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় পর্যন্ত তার প্রতিটি মুহূর্ত ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। তিনি একদিকে যেমন সর্বাধিক গোলদাতা, তেমনি সর্বাধিক অ্যাসিস্ট প্রদানকারীও। ফুটবলের ভাষায় মেসি শুধুই একজন খেলোয়াড় নন, তিনি হয়ে উঠেছেন এক শিক্ষা, এক অনুপ্রেরণা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অবিনাশী কিংবদন্তি।

বিশ্ব ফুটবলে মেসির অবস্থান

যদি পেলé, মারাডোনা, ক্রুইফ বা ফেদেরারের মতো আইকনদের একটি তালিকা করা হয়, মেসি নিশ্চিতভাবেই তার শীর্ষে থাকবেন। তিনি শুধু আর্জেন্টিনার সেরা নন, বরং অনেক বিশেষজ্ঞের মতে সর্বকালের সেরা ফুটবলার। ৮টি ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য লিগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং বিশ্বকাপ জয়—এসব অর্জন মেসিকে ইতিহাসে অমর করে দিয়েছে। তার খেলার ধরণ, বিনয়ী ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তকে মুগ্ধ করেছে।

ভক্তদের আবেগ ও সম্ভাব্য বিদায়ের প্রভাব

মেসি ফুটবল ভক্তদের কাছে শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি আবেগের আরেক নাম। আর্জেন্টিনার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ছোট গ্রাম, ইউরোপের স্টেডিয়াম থেকে আফ্রিকার স্কুল মাঠ—যেখানেই ফুটবল খেলা হয়, মেসির নাম সেখানেই উচ্চারিত হয় ভালোবাসা নিয়ে। তার সম্ভাব্য অবসরের খবর ভক্তদের হৃদয়ে দুঃখের সঞ্চার করেছে, তবে একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতার আবেশও তৈরি করেছে। কারণ, তারা জানে তারা এমন একজনকে খেলতে দেখেছে, যিনি হয়তো আর কখনো জন্ম নেবেন না।

JitaBet ,  JitaWin তে আপনার বাজি ধরুন,   তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!

FAQs

মেসি কি সত্যিই অবসর নিতে যাচ্ছেন?
তিনি সরাসরি অবসরের ঘোষণা দেননি, তবে ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচটিকে শেষ হোম কোয়ালিফায়ার বলেছেন।

মেসি কি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবেন?
তিনি এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ তার শেষ টুর্নামেন্ট হতে পারে।

আর্জেন্টিনা কি মেসির পর টিকে থাকতে পারবে?
হ্যাঁ, বর্তমানে আর্জেন্টিনার দলে শক্তিশালী নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা বড় দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।

কেন ভেনেজুয়েলার ম্যাচটি বিশেষ?
কারণ এটি হতে পারে মেসির শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ ঘরের মাঠে, তার পরিবারের উপস্থিতিতে।

মেসি কি এর আগে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার পর তিনি অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবে পরে ফিরেছিলেন।

উপসংহার: এক যুগের সমাপ্তির পথে?

লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার ইতিমধ্যেই পূর্ণতা পেয়েছে। তিনি জিতেছেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং অগণিত ব্যক্তিগত পুরস্কার। এখন তিনি যা করবেন, সেটি কেবল নিজের ইচ্ছার জন্য করবেন, প্রমাণের জন্য নয়।

ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচটি হয়তো সত্যিই হতে পারে তার শেষ হোম কোয়ালিফায়ার। যদি তাই হয়, তবে আর্জেন্টিনার মাটিতে এটি হবে এক ঐতিহাসিক বিদায়। তবে মেসি আগে অবসরের ঘোষণা দিয়ে ফিরে এসেছেন—তাই ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করবে শেষ পর্যন্ত।

একটা বিষয় অবশ্যই পরিষ্কার: মেসি অবসরে গেলে তিনি যাবেন একজন কিংবদন্তি হিসেবে, যিনি শুধু আর্জেন্টিনার নয়, গোটা বিশ্বের ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

For More Update Follow JitaSports English News and JitaSports BD News